যেখানে মৃত্যুর গন্ধ মেখে শূন্যতা লিখছে চিল

সৌমনা দাশগুপ্ত

“O my friend, there is no friend.” – Jacques Derrida


প্রথম দৃশ্যে একটা জানলা। ক্যামেরা জুম করা হচ্ছে... আরও আরও... গোটা পর্দা জোড়া জানলা। পাঁশুটে নীল আকাশ, একা একটা চিল উড়ছে উড়ছে... ছোট হতে হতে হতে মিলিয়ে যাচ্ছে শূন্যে
--আপনি কি পুড়তে ভালোবাসেন?
--হ্যাঁ।
--আপনি কি আগুনের গন্ধ পান?
--হ্যাঁ।
--আপনি কি নিজের মাংসের গন্ধ পাচ্ছেন?
--হ্যাঁ।
--আপনার খুলি ভেদ করে গড়িয়ে নামছে তরল সীসা, আপনি টের পাচ্ছেন?
--হ্যাঁ।
বিষণ্ণ হলুদ চেয়ারে একা একটি পাইপ পড়ে আছে, তার পাশে চূর্ণ তামাকপাতাॠঅন্তর্গত দহনে ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছে সে। আসলে কি চেয়ারটিই একা, না ওই পাইপ, না এককোণে পড়ে থাকা তামাকের পাতা! থিকথিকে ভিড়ের মধ্যে, উৎসবের মধ্যে, মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে, সরাইখানা ও শুঁড়িখানাঠভিড়ের মধ্যে, একঝাঁক মানুষের মধ্যে আড্ডা দিতে দিতে ক্রমে ক্রমে একা হয়ে যাচ্ছে সে। যেন জনহীন অরণ্যের ভেতর এক ভাঙা দেউল, সেখানে তেলহীন একা এক প্রদীপ, শিখাহীন, পুড়েই চলেছে। অথবা একটা রাস্তা পড়ে আছে বিষণ্ণ সরীসৃপের মতো। দুপাশের সরলগাছের অরণ্য, মাঝখানে শুয়ে আছে রাস্তা। এতটাই একা, এতটাই নির্জন যে, কান পাতলেই তার করোটিজোড়া ঘুণপোকার ক্রমাগত দংশনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। রাশি রাশি ঘন সবুজ বৃক্ষরাজিঠমধ্যেও প্রকট হয়ে উঠছে তার কালো অ্যাসফল্টৠর শরীর, আসলে কালো নয়, এই রং বেদনার, এই রং নিঃসঙ্গতাঠ°, যেন খোলসের ভেতর নিজেকে আরও ঘনভাবে জড়িয়ে নিচ্ছে সাপ।
‘লক-ডাউন’ শব্দবন্ধটি কি আমাদের নতুন করে নিঃসঙ্গতাঠ° অভিধা শেখালো! হয়তো হ্যাঁ, হয়তো বা না। আসলে লক-ডাউন আমাদের দিয়েছে এক আপাত নিঃসঙ্গতাॠ¤ করেছে ঘরবন্দি। কিন্তু আমরা কি এমনিতেই নিজের তৈরি করা এক কুঠুরির মধ্যে বন্দি নই? সেখানে আমিই আমার একমাত্র বন্ধু, যা কিছু কথা বলা, একমাত্র নিজের সঙ্গেই। আমরা, যারা সাহিত্য, শিল্প বা যে কোনো রকম সৃজনশীল কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছি, তারা কি প্রকৃতেই একা নন! এই অখিল ব্রহ্মাণ্ড ে কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে বসবাসকারী তারাদের মতো এই মানুষগুলিঠআসলে এক একটি তারা কিম্বা গ্রহের মতো বিচ্ছিন্ন একক নন? যাকে সেই কোন কালে জীবনানন্দ বলেছেন, ‘নিজেরই মুদ্রাদোষৠএকা’। ধরা যাক, একজন কবি, একজন অক্ষরশ্রমঠ¿à¦• যখন শব্দের সঙ্গে শব্দের নিষেক ঘটিয়ে একটু একটু করে দেহদান করছেন তাঁর সৃষ্টিকে, সেই ভাবনা কি শুধুমাত্র সীমাবদ্ধ থাকছে তাঁর লেখার সময়টুকুতেঠ‡à¥¤ তা কিন্তু নয়, এই সৃজন আসলে খেয়ে নিচ্ছে, গ্রাস করছে তাঁর সম্পূর্ণ যাপিত সময়কে। ফলে বাজার করতে করতে, রান্না করতে করতে, অফিসে বা ব্যবসার কাজ করতে করতেও তিনি আসলে বুঁদ হয়ে আছেন অক্ষরের নেশায়। ফলে দুধরনের সত্তা তাঁর মধ্যে নিয়ত জায়মান। সংসারে থেকেও তিনি এক উদাসীন সন্ন্যাসীॠআর একটু বিশদে বললে, দৈনন্দিন জীবনের যে বেঁচে থাকা, এই যে খাওয়া ঘুম রুজিরোজগাঠ° মৈথুন সন্তান উৎপাদনের যে জীবন, তারই সঙ্গে সমান্তরাল আরও একটা জীবন আমরা বাঁচি। সেখানে আমারই একটা আলাদা সত্তা, একটা আলাদা ব্যক্তিত্ঠঅবিরল সেই জীবনের অনুবাদ করে চলেছে । সচেতন ও অবচেতনের এক দ্বন্দ্ব নিরন্তর খেলা করে। ব্যক্তিগত পরিসরে এসে নিজের অভিজ্ঞতার কথা যদি বলি, ধরা যাক সকাল থেকে কবিতার কিছু পঙক্তি মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, অথচ আমি কিন্তু লিখছি না, মানে আমার যাপিত জীবন তখন আমাকে লিখতে বসার কোনও সুযোগই দিচ্ছে না, আমি ঘরের কাজ করছি, রান্না করছি, খেতে দিচ্ছি, সবকিছুই করছি, আবার আমি আসলে এসব কিছুই করছি না। আমার ভেতরে তখন জারিত হচ্ছে একটি কবিতা। ফলে এই আপাত যাপনের ভেতর আমি তখন থেকেও নেই। স্রষ্টা আমি তখন প্রবলভাবে জানান দিচ্ছে, এদিকে কাজ করতে আমি বাধ্য বলেই যন্ত্রের মতো কাজ করে যাচ্ছি। তখন কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি একা, বিচ্ছিন্ন এই সমাজ-সংসার থেকে।
আর এখান থেকেই শুরু হয় à¦†à¦¤à§à¦®à¦‰à¦¨à§à¦®à§‹à šà¦¨à¥¤ যেমন একটি মোচা ছাড়াতে গেলে হাতে কালো দাগ ও আঠা লেগে যায়, তেমনই অন্তর্নিহঠত বিষ ও বিষাদ লেগে যাচ্ছে স্রষ্টার আত্মায়। তিনি যেন এক প্রাচীন গুহামানব, এক কোটরবাসী, যিনি এই দৈনন্দিনেঠপৃথিবীর থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে একান্তে বসেছেন। কলকে-কলিজা §Ÿ টান দিয়ে শুষে নিচ্ছেন রাশি রাশি কুণ্ডলিত ধোঁয়া। আর এই দ্বৈত সত্তার টানা ও পোড়েন তাঁকে নিরন্তর একা করে দিচ্ছে। তিনি আর নিজেকে মেলাতে পারছেন না তাঁর যাপিত জীবনের সঙ্গে। তখনই শুরু হয় সেই অবিরাম কথোপকথনের পালা, নিজের সঙ্গে নিজের।
শব সাধনায় সে এক তান্ত্রিক
মৃতের আধার থেকে আরো দূরে বিদ্যুতে বসেছে
তার খুলি থেকে ঝরে পড়ে
হাহারব ছেঁড়া ছেঁড়া ছাই

সেই আকাশটির কাছে আবারও ফিরে যাই, ফিরে যাই সেই নির্জন চেয়ারটির কাছে। আর দেখতে পাই একজন কবি হাসপাতালেঠবিছানায় শুয়ে লিখে ফেলছেন আশ্চর্য সব কবিতা, আর অন্যদিকে রংপাগল এক উন্মাদ স্যাঁ রেমির অ্যাসাইলাঠ®à§‡à¦° ভেতরে বসে এঁকে যাচ্ছেন নক্ষত্রের আকাশ( দ্য স্টারি নাইট )। আসলে সারাজীবন নিজেই নিজের রক্তপাত মুছতে মুছতে কোনদিন থেকে যেন এই রক্তের গন্ধই তাঁর ভালো লাগতে শুরু করেছে, আর তিনি বিবৃত করে চলেছেন তাঁর অন্তর্গত ক্ষরণকে। তাঁর ‘হলুদ বাড়ি’ ভেঙে গেছে, বন্ধুত্বেঠমৃত্যু তাঁকে বারবার হিঁচড়ে টেনে এনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে ক্যানভাসেঠ° সামনে, আর তিনি সেই সেই ক্যানভাস ভরিয়ে ফেলছেন অভ্যন্তরীঠ£ শূন্যতার অনুবাদে। এমনকি তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘দ্য পোট্যাটো ইটারস’এও আমরা দেখি, ভোজনরত মানুষগুলি সমবেত ভোজের সময়ের আড্ডায় মেতে নেই, তারা যেন প্রত্যেকে একা বিচ্ছিন্ন এক একজন মানুষ, নির্জন মানুষ, বয়ে চলেছে নিজস্ব বিষণ্ণতার ভার। আসলে সারাজীবন ধরে এই নিঃসঙ্গ শিল্পী খুঁড়ে চলেছেন তাঁর ভেতরের জীবন, করে চলেছেন à¦†à¦¤à§à¦®à¦¸à¦®à§€à¦•à§à ·à¦£à¥¤ বারবার করে তিনি এঁকে চলেছেন এক শূন্য, নির্জন চেয়ারের ছবি, যা আসলে তাঁর নিজেরই জীবনের এক সমার্থক শব্দ। আর তাই দেখি, সম্পর্ক নিভিয়ে দিতে দিতে একসময় তিনি চলে যাচ্ছেন আত্মধ্বংসৠ‡à¦° দিকে।
স্কিৎজোফ্ঠ°à§‡à¦¨à¦¿à¦• ও বাইপোলার ডিসঅর্ডারৠর শিকার এই শিল্পী তাঁর মাত্র সাঁইত্রিশ বছরের জীবনে দেখে গিয়েছেন ‘রেড ভাইনইয়ার্ঠ¡â€™ ছাড়া আর কোনো ছবিই বিক্রি হচ্ছে না। আজীবনের অর্থকষ্ট, সমাজে থেকেও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার অভ্যাস, বন্ধু ও প্রিয়বিচ্ঠেদ তাঁকে করে তুলেছে পুরুষাঙ্গৠ‡ সূঁচ বেঁধানো বুলফাইটের সেই ষাঁড়টির মতোই একই সঙ্গে জেদি এবং অসহায়। এই লড়াইয়ে তিনি যেন নিজেই সেই ম্যাটাডোর হয়ে কেটে ফেলছেন নিজের কান, তুলে ধরছেন ‘সিক ট্রফি’র মতো, পাঠিয়ে দিচ্ছেন এক বারবণিতার কাছে। এই পৃথিবীতে থেকেও তিনি এক নেই শহরের বাসিন্দা। দালাল আর ভাঁড়েদের এই জলসার ভেতরে রঙের নেশায় মজে থাকতে থাকতে আর বারবার নিজেকে অতিক্রম করার এক আপ্রাণ চেষ্টায় ক্ষত-à¦¬à¦¿à¦•à§à¦·à ¤ হতে হতে একদিন হাতে তুলে নিয়েছেন রিভলবার, নিজেকেই বিদ্ধ করেছেন বুলেটে। আচ্ছা, তখন তিনি কোথায় ছিলেন, কী করছিলেন? আমরা দেখব, তখনও কিন্তু তিনি একটি গমখেতের ভেতর দাঁড়িয়ে ছবি আঁকছিলেন। ক্যানভাস, রং আর ব্রাশ, যা ছিল তাঁর নিজেকে দেখার দর্পণ, নিজেকে ফুটিয়ে তোলার পর্দা, সেইসব প্রিয়সান্ন িধ্যে থাকার সময়ে, নিজের চূড়ান্ত প্যাশনকে জাপটে জড়িয়ে থাকার সময়ে এভাবে নিজেকে শেষ করে ফেলা, আমাকে জীবনানন্দৠর কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার মনে হয়, এ কি সেই উদাসীনতা, স্ত্রী ছেলে পাশে শুয়ে আছে, সুখী দাম্পত্যেঠছবি, তারই মধ্যে মরে যাবার সাধ! না বোধহয়। তিনি তো কোনও শৌখিন জাংক জুয়েলারি নন, শুধু আত্মপ্রদরৠশনই যার স্বভাব, তিনি আসলে ভেতরে ভেতরে এক অন্ধকার-à¦†à¦šà §à¦›à¦¨à§à¦¨ মানুষ, যাঁর হৃদয় কুয়াশাবৃত, আর সেই কুয়াশার চলচ্ছবি তিনি নির্মাণ করে গেছেন সম্পূর্ণ জীবন ধরে। অন্ধ বিষণ্ণতা আর ঘূর্ণিঝড়েঠ° মতো অস্থিত মানসিক অবস্থা নিয়ে উসকে দিচ্ছেন মৃত্যুর সলতে, যে বোধ সম্ভবত প্রত্যেক স্রষ্টার মনের ভেতরেই পাক খায়, আর সেই সংবেদ পৌঁছে যায় তাঁর মস্তিষ্কে, করে তোলে একক মানুষ, করে তোলে আত্মহত্যাঠ্রবণ। তাই মৃত্যুর আগে তাঁর সেই অমোঘ উচ্চারণ হয়ে ওঠে এই গ্রহের সমস্ত সৃষ্টিশীল মানুষের উচ্চারণ,

“This sadness will last forever.”